Onlyfan Premium Videos

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি

........…....তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি...............

......................আরভান শান আরাফ........ 


জমির শেখ বাসায় ফিরে তার ছোট ছেলে শুভ কে দেখতে না পেয়ে রেগে ফোঁসে উঠল। তার স্ত্রী শাহনূর বেগমের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম।এমনিতে জমির শেখ রাগি৷ পরিবারে তার কড়া নিয়মে সবাইকে চলতে হয়৷ কিন্তু তার একমাত্র ছেলে শুভ সেই নিয়মের ধার ধারেন বলে মনে হয় না৷ সে তার মত চলে। স্কুলে কামায় করে সারাদিন বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়।ইদানীং তার হাব ভাব আরো বদলে গেছে।

সদ্য কৈশরে পা দেওয়া শুভ৷আজ তার কপালে শনি আছে। শাহনূর বেগম পাশের বাড়ির কুহিনূরের কাছে গেল৷ কূহিনূর জাফর সাহেবেরে স্ত্রী৷ জাফর সাহেব প্রবাসী।ওনার একমাত্র ছেলে আয়মান। ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তির পর থেকে ই শুভর সাথে তার সখ্যতা।হয়তো আয়মান জানে শুভ কোথায় তাই শাহনূর বেগম তার ছেলের খবরের জন্য আয়মানের কাছে এসেছে। 

ভরদুপুর৷ গরমের ছুটি চলছে স্কুলে। আয়মান বারান্দায় বসে জাম খেয়ে খেয়ে তার বীজ দিয়ে নিশানা ছুড়ছিল। সেই সময় শাহনূর বেগম আয়মানের সামনে এসে দাঁড়াল। আয়মান একবার তাকিয়ে দেখে আবার জাম খাওয়াও মনোযোগ দিল। ভদ্রমহিলা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল

-কিরে বাপ,তুর শুভ ভাইরে দেখছস? 

আয়মান মানা নেড়ে না জবাব দিল৷ 

-যা না বাপ। একটু খোঁজে দেখ। তুর বড় আব্বা এসে রাগারাগি করছে। 

আয়মান দৌড়ে বের হয়ে যাচ্ছিল কিছু না বলে। শাহনূর বেগম আবার ডাক দিল

-ঐ বাপ, যাবি না? 

আয়মান হনহন করে হেঁটে যেতে যেতে বলল

-যাচ্ছি ত। 

শাহনূর বেগম আশ্বস্ত হল। কারন এর আগে প্রতিবার শুভকে আয়মান ই খোঁজে এনেছে। আজো হয়ত আনবে৷ তা নাহলে জমির শেখ লঙ্কা কান্ড ঘটাবে। 

আয়মান জানে শুভ কোথায়। সকালে যখন একসাথে মার্বেল খেলছিল তখন শুভ এসে আয়মানের কানে কানে ফিসফিস করে বলছিল

-এই আয়মু, বিলে যাবি? 

আয়মানের ইচ্ছে করছিল যেতে৷ কিন্তু মা বলেছিল মামা আসবে। তাই সে বলল

-তুমি ই যাও। আমার মামা আয়বে। 

আয়মানের কাছে শোনা 'না'টা শুভ ঠিক হজম করতে পারলো না। রাগে সবগুলো মার্বেল হাতে নিয়ে এক ঢিলে পুকুরে ফেলে দৌড়ে চলে গেল। আয়মান মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থেকে খানিকবাদে কেঁদে দিল। আশেপাশের অন্য ছেলেরা শুভর পিছনে ছুটতে লাগলো। 


জৈষ্ঠের খা খা রোদ্র।বিলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। চারিদিক কাদা কাদা করে ছেলেরা ফুটবল খেলছে। শুভ কে দেখা যাচ্ছে গোল পোস্টে মনোযোগ দিয়ে দাঁড়িয়ে। আয়মান একটু দূর থেকে ডাক দিল

-ও শুভ দা। বড় আব্বু ডাকে তোমারে। 

শুভ জবাব দিল না। আয়মান আবার চেঁচালো

-আরে ও দাদা, জলদি আয়তা। নাহলে তোমায় মারবে। 

-তুই যা। আমি যামু না। 

আয়মান শুভ'র কথা না মেনে কাদায় হেঁটে গিয়ে শুভ'র হাত টেনে ধরে বলল 

-চলো ত। আর খেলতে হয়বে না। আমার লগে না গেলে তোমারে মাইর দিব ত৷ উ দাদা৷ আসো না। 

শুভ আয়মানের টানাটানিতে রেগে গিয়ে ওর পিঠে চটাৎ চটাৎ কয়েকটা থাপ্পড় কষে দিল। 

থাপ্পড় খেয়ে ঠা ঠা করে চিৎকার দিয়ে কাঁদায় গড়াগড়ি করে কাঁদতে লাগলো। শুভ আর বাদ বাকি ছেলেরা বিরক্ত হয়ে আয়মানকে টেনে তুলে রাস্তায় উঠিয়ে দিয়ে আবার খেলায় মন দিল। 

আয়মান কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির দিকে চলল। 


শুভ বাড়িতে ফিরলো সূর্য ডুবার পর। জমির শেখ তার রুমে ব্যবসার হিসেব নিয়ে ব্যস্ত ছিল৷ এই সুযোগে সারা শরীরে কাঁদা নিয়ে ঢুকে গেল। সেদিন সেই যাত্রায় শুভ'র মা তাকে বাঁচিয়ে দিল। 

জমির শেখের একমাত্র ছেলে শুভ। ছোট সময় থেকে ই সে দূরন্ত৷ দস্যিপনায় পড়াশোনা সব বিকিয়ে দিয়েছে।অষ্টম শ্রেণিতে পা দিয়েছে কোন মতে পাস করে। গ্রীষ্মের ছুটি প্রায় শেষ। জমির শেখের চিন্তার অন্ত নেই তার ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। মাঝে মাঝে ভাবে শুভকে তার বড় ভাইয়ের কাছে ঢাকা পাঠিয়ে দিবে। পরক্ষণে ভাবে, এই ছেলেকে ছাড়া সে যেমন থাকতে পারবে না তেমন তার স্ত্রী ও। 


গ্রীষ্মের ছুটি শেষ। শুভ আর আয়মান একদিন স্কুল যাওয়ার পথে নিতাই ভট্টাচার্যের পুকুর পাড়ের আমগাছে কাকের বাসায় ঢিল ছুড়ছিল। সেই সময়টা নিতায়ের ছোট মেয়ে আশালতা বের হওয়ার সময় ঢিল গিয়ে তার মাথায় পড়ল। মাথা ফেটে যখন রক্তে রক্তাক্ত তখন সে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। শুভ এই সুযোগে দৌড়ে পালিয়ে গেলে ও আয়মান ধরা পড়ল। 

ঘটনা বেশি দূর গড়াতে দেয়নি আয়মানের মা৷ বেচারি একা চারদিক সামলানোর পর রোজ ছেলের নামে একটা না একটা নালিশ। আজ সারাদিন আয়মানকে ঘরে আটকে রেখেছিল৷ কুহিনূর তার একমাত্র ছেলেকে নিয়ে চিন্তিত।শুভ'র পাল্লায় পরে তার ছেলেটা দিন দিন দস্যি হয়ে যাচ্ছে৷ ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত আয়মানের মা সিদ্ধান্ত নিল আয়মানকে শহরে তার নানা বাড়ি পাঠিয়ে দিবে৷ সারাদিন ছেলেকে অনাহারে রেখে নিজে ও কিছু মুখে দেয়নি। 

সন্ধ্যার দিকে শুভ বাড়ির পিছন দিয়ে এসে আয়মানের রুমের পিছনের জানালায় টুকা দিয়ে তাকে ডাকতে লাগলো

-এই আয়মান৷ এই

আয়মান সারাক্ষণ কেঁদে চোখ ফুলিয়ে, বুক ভাসিয়ে এই মাত্র চোখ দুটি বন্ধ করেছিল। শুভ'র গলা শুনে লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে জানালা খুলে শুভকে দেখে এক গাল হেসে বলল

-আরে শুভ দা। তোমারে মারেনি ত?

-আরে নাহ৷ আমি তো বাড়িতে ই যায়নি। এই নে আম খা।। 

জানালার গ্রিল দিয়ে দুইটা পাকা আম ঢুকিয়ে  দিল শুভ। 

আয়মান সেগুলো টেনে নিতে নিতে বলল

-তোমার কয়? তুমি খায়বা না? 

-আমার তো আছে। নে কলা গুলো ও রাখ। ভেতরে বসে খা৷ আর শোন, তরে জিজ্ঞেস করলে বলবি ঢিল আমি ছুড়েছি। তুর নাম বলবি না। 

-আমি কিছু বলিনি শুভদা। তোমার নাম বললে তোমায় বড় আব্বু মারবে।। 

-আরে নাহ। মারবে না। শুন,কাল স্কুলে না গিয়ে পূর্ব পাড়ায় মাছ ধরব। যাবি?

আয়মান খুশিতে উচ্ছাসিত হয়ে বলল

-হ। যামু।


এইভাবে তালশহর গ্রামের দুই বাল্যবন্ধু হেসে খেলে বড় হচ্ছিল। তাদের দস্যিপনা,আর অত্যাচারে গ্রামের প্রায় মানুষ বিরক্ত হলে ও কেউ কেউ তাদের খুব পছন্দ করতো৷ নালিশ দিতে দিতে সবাই কাহিল হয়ে এক পর্যায়ে নালিশ দেওয়া ই বন্ধ করে দিল।

শুভ আর আয়মান যেন হরিহর প্রাণ। গ্রামের লোকেরা তাদের মানিক জোড়া উপাধি দিয়ে দিল। তাদের দলে আরো আছে সবুজ,সুমন,নূরা পন্ডিত। শুভ'র আয়মানের প্রতি আলাদা টান৷ সে আয়মানকে ছাড়া যেমন এক পা চলে না তেমন আয়মান ও তার শুভদা ছাড়া কিছু বুঝে না৷ শুভদার সাথে না চলার জন্য কার মার খেলো, কতবার সারাদিন অনাহারে থাকলো তবু তার শুভদার সাথে চলতে হবে৷ স্কুলে যাওয়া,চতুর্থ ঘন্টার পর পালিয়ে যাওয়া,ফল পাড়া,মাছ ধরা, খেলা সব কিছু তার শুভদার সাথে ই করতে হবে।। সারাদিন রোদ্রে ঘুরে বেড়ানোর যে আনন্দ তা কেবল শুভদার সাথে ই পাওয়া যায়। 


বার্ষিক পরিক্ষায় শুভ সাত বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সে অষ্টম শ্রেণীতে ই রয়ে গেল৷ আয়মান দুই বিষয়ে অকৃতকার্য হয়ে বিশেষ বিবেচনায় সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলো। আয়মানের ফলাফল দেখে কুহিনূর বেগমের মাথায় যন্ত্রনা ধরে গেল৷ পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাওয়া ছেলে টেনে টুনে পাশ করবে এটা সে মেনে নিতে পারেনি।। ঐদিকে জাফর সাহেব শুভকে ঘরে আটকে রেখে খাওয়া দাওয়া অফ করে দিয়েছে।। সারা রাত্রি আয়মানের মা জেগে কেঁদে কাটানোর পর সকালে তার ভাই এসে হাজির৷। সেই দিন ভোরে ই আয়মানকে সাথে নিয়ে চলে গেল শহরে তার বাবার বাড়ি। 

সময় বহমান নদীর মত৷জাফর সাহেবের স্ত্রী কূহিনূর তার ছেলেকে নিয়ে গ্রামে সব পেছনে ফেলে চলে গেল। জমির শেখ তার পুত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা সময় পর্যন্ত চিন্তিত ছিল কিন্তু হুট করেই শুভ অনেকটা শান্ত হয়ে যায়। তেরো বছর বয়সের ছেলেদের শান্ত থাকা আনন্দহীনতার স্বরূপ৷ শুভ ও অনেকটা নিরানন্দ হয়ে গিয়েছিল৷ যে ছেলেকে চতুর্থ ঘন্টার পর কোন দিন শ্রেণিকক্ষে বসে থাকতে দেখা যায় নি৷ সেই ছেলে ছুটির ঘন্টা অবধি ক্লাসে বসে থাকতো। সন্ধ্যার পর এই পাড়া ঐ পাড়াতে ঘুরে বেড়ানো শুভ বই নিয়ে বসে পড়ত৷ সকাল বিকেল তিন বেলা টিউশনে ও যেত। এই শুভ খুব অচেনা৷ মাঝে মধ্যে তাকে আয়মানদের বাড়ির পেছনের পুকুর ঘাটের নারিকেল গাছের ছায়াতে বসে বসে পানিতে ঢিল ছুড়তে দেখা যায়। 


১২ বছর পরের কথা,দিল্লী মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্রেজুয়েশন শেষ করে আয়মান বাড়ি ফিরেছে তিন দিন হল। পাঁচ বছর আগে সে দিল্লীতে পাড়ি দিয়েছিল৷ আজ পাঁচ বছর পর বাড়ি ফিরে তার মায়ের হাতের মুগ ঢালের চচ্চরি খেতে তার মন কেমন করে উঠল৷ মা গ্রামে চলে গেছে বছর দুয়েক আগে। তার ছোট বোন,বাবা আর মা গ্রামে ই থাকেন। আয়মানের বিশেষ কিছু কাজ থাকায় সে কয়েক দিন শহরে থেকে গেল। 


শীতের সন্ধ্যা। তালশহর গ্রাম আগের মত নেই৷ এখন এটা পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত। মফস্বল শহর বলা যেতে পারে।আয়মানের মনে তালশহর গ্রামের যে রূপ ছিল তা সম্পুর্ণ পালটে গিয়েছে৷ বারো বছর পর নিজের জন্মস্থানে পা দিয়ে মনটা কেমন করে উঠল। নিজের অজান্তে ই চোখের পল্লব ভিজে গেল তার। 

রাস্তা ঘাট কিছুই চেনা যাচ্ছে না। ট্রেন থেকে নেমে রিকশাওয়ালাকে তালশহর বলাতে বাজারে এনে নামিয়ে দিয়ে গেল৷ ফোনে ও চার্জ নেই যে বাবাকে ফোন দিবে। হঠাৎ করেই পেছন থেকে কেউ একজন বলল

-গ্রামে নতুন নাকি? 

আয়মান পিছন ফিরে তাকালো৷ খুব সুন্দর একটা সাতাশ আটাশ বছরের লোক। পায়জা পাঞ্জাবি পড়া৷ মুখে হালকা দাড়ি। হাতে বাজারের ব্যাগ। আয়মানের খানিক সময়ের জন্য মনে হলো লোকটাকে চিনে। আয়মান কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বলল

-জাফর শেখের বাড়িতে যাব। পথ অচেনা লাগছে। 

ছেলেটা দু পা সামনে গিয়ে বলল

-আমার পেছনে আসুন। 

আয়মান ওকে অনুসরণ করে হাঁটতে লাগলো। পথে যেতে যেতে নিশ্বাসের শব্দ ব্যতিত আর কোন শব্দ হয়নি তাদের মধ্যে। 

পাঁচ বছর পর মায়ের আর বাবার আদরে আয়মান খুশিতে প্রফুল্ল৷ ছোট বোন তিতলি সারাক্ষণ ভাইয়ের পিছনে ঘুর ঘুর করছে ব্যাগ ভর্তি কি এনেছে দেখার জন্য। বাড়িতে ফিরে আয়মান সবার আগে দৌড়ে জমির শেখের কাছে গেল৷ তার বড় আব্বা আর বড় আম্মাকে সালাম করে সোফায় বসে নারিকেলের নাড়ু খেতে খেতে খেয়াল করলো, পাশের রুমে পথ চিনিয়ে দেওয়া পাঞ্জাবি পড়া লোকটা বসে খুব মনোযোগের সাথে বই পড়ছে।আয়মান বিস্মিত হয়ে তার বড় আম্মাকে জিজ্ঞেস করল

-ঐ লোকটা কে? 

শাহিনূর বেগম ফিক করে হেসে বলল

-ওটা তর শুভ দা পাগল। তুই তর শুভদাকে ভুলে গেলি? ছোট বেলা তো শুভকে ছাড়া দম বন্ধ হয়ে যেত। ১২ বছরে সব ভুলে গেলি?

আয়মান স্থির হয়ে গেল। পলকহীন দৃষ্টিতে শুভ'র দিকে তাকিয়ে থেকে এক সময় রুম থেকে বের হয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। কূহিনূর বেগম তখন রান্না ঘরে৷ ছেলেকে এভাবে যেতে দেখে কিছুটা অবাক হয়ে আবার রান্নায় মনোযোগ দিল। 

আয়মানের সারা রাত্রি ঘুম হলো না। সেই বাল্যকালে যার জন্য তার এত আবেগ ছিল, যে মানুষটা তার চলে যাওয়া ফেরায়নি৷ কোন দিন একটা চিঠি লিখেনি, যার কাছে এতগুলা চিঠি লিখে, মাকে দিয়ে এতবার খবর পাঠিয়ে ও খবর পায়নি সে মানুষটাকে এত বছরে পরে দেখে ও তার ভেতরটা কেমন করে উঠল। ভালবাসার আবেগ বড় কঠিন আবেগ৷ তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইশ্বর তাকে দিয়েছে বলে তার জানা নেই। 


পরের দিন সকাল বেলা, শুভ ঘুম থেকে জাগার পর তার পা এক বাটি পায়েস ধরিয়ে দিয়ে বলল

-যা, আয়মানকে দিয়ে আয়৷ 

শুভ মানা না করে পাঞ্জাবিটা গায়ে দিয়ে বাটি নিয়ে তাদের বাড়িতে গেল। আয়মানের মা শুভকে দেখে মিষ্টি হেসে বলল

-তর শিষ্য বেলা বারোটা অবধি ঘুমাচ্ছে৷ যা ডেকে তুল। 

শুভ ধীর পায়ে আয়মানের রুমে ঢুকলো। আয়মান উপুর হয়ে শুয়ে ছিল। তার ফর্সা পিঠে সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। অবুঝ, নিষ্পাপ শিশুর মত তার ঘুম৷ অপূর্ব সুন্দর, রাজপুত্রের মত তার অবয়ব। শুভ মুগ্ধ হয়ে তার পিঠে আলতু করে চুমু দিয়ে পায়েসের বাটিটা টেবিলে রেখে বের হতে যাবে এমন সময় আয়মান লাফ দিয়ে ঘুম থেকে উঠে বসে জড় কন্ঠে বলল

-শুভদা! 

শুভ ফিরে তাকালো। আয়মানের ঘুম ঘুম চোখে পানি চিকচিক করছে। 

সে গিয়ে আয়মানে পাশে বসলো।চব্বিশ বছরের যুবক আয়মান লাফিয়ে গিয়ে শুভ কে জড়িয়ে ধরলো৷ শুভ কিছু বুঝতে পারিনি৷ আজ যে তার বড় আনন্দের দিন৷ তার পাগল তার কাছে ফিরে এসেছে৷ তার শৈশবের ভালবাসা তাকে আলিঙ্গন করেছে। শুভ'র ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে কাঁদতে৷ সে আয়মানের কপালে চুমু খেতে ই আয়মান লজ্জায় লাল হয়ে গেল।এত দিন পর সেই ভালবাসার স্পর্শ৷ আগে কতবার শুভ'র হাতে মার খাওয়ার পর রাতে ঘাট তলায় বসে আয়মানকে শুভ প্রতিটি অংশে চুমু খেত। সেই প্রেমের স্পর্শের স্মৃতি নিয়ে আয়মান টিকে ছিল। 


সম্পুর্ন বদলে যাওয়া গ্রামের আনাচে কানাচে তাদের স্মৃতি জড়িত৷ খেলার মাঠ,পুকুরের ঘাট,উত্তরের জঙ্গলা,পূবের বিল সর্বত্র তাদের ভালবাসা বিরাজমান। শুভ স্থানীয় হাই স্কুলের শিক্ষক। আয়মান পেশায় ডক্টর৷বিয়ের জন্য চাপাচাপি করা হচ্ছে দুজনকে ই৷ শুভ অনেক কষ্টে পরিবারকে সামলে রেখেছে। বাল্যকালের প্রেমের স্মৃতি তাকে বাধ্য করেছিল একা কাটাতে। আজ তার ভালবাসা তার সাথে ই আছে ।আজ আর সে একা নয়। 

সেদিন রাতে শুভ যখন আয়মান কে আদর করছিল তখন আয়মান শুভ'র বুকে মাথা রেখে বলেছিল

-এভাবে আর কতদিন৷ চলো চলে যায়। 

শুভ সাত পাঁচ না ভেবে ই বলল

-হ্যা চলো। কিন্তু কোথায় যাব? 

-ইন্ডিয়াতে। সেখানে আমার বন্ধুরা আছে৷ তুমি আর আমি ছোট একটা সংসার বানাব৷ তারা সাহায্য করবে। 

কিছুদিন পর, দুজন এক সাথে পাড়ি দিল ভারতের উদ্দেশ্য। দুজন ই তাদের পরিবারকে বুঝালো পেশাগত উদ্দ্যেশ্যে যাচ্ছে৷


আজ পূর্ণিমা৷ আয়মান বারান্দায় বসে কফি হাতে আকাশের চাঁদ দেখছে৷ শুভ রান্না করছিল। আয়মান যখন আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে ছিল শুভ তখন পেছন থেকে আয়মানকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেল৷ আয়মানের চোখ ভিজে উঠলো৷ ইশ্বর তাকে এত সুখি করেছে কেন? এত চমৎকার একজন কে সে জীবনসঙ্গী করে পেয়েছে।। আয়মান ফিরে তাকাকো শুভ'র দিকে৷ শুভ ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পড়েছে৷ তার খোচাখোচা দাড়িতে হলুদ লেগে আছে৷ চাঁদের আলোয় সেই হলুদ রঙ অদ্ভুত সুন্দর দেখাচ্ছে৷ আয়মান শুভ'র বুকে মাথা রেখে হেসে উঠল৷ তার হাসি ভারতবর্ষের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ল আনন্দের ফোটা হয়ে। 

(সমাপ্ত)

 

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি Reviewed by সমপ্রেমের গল্প on June 06, 2021 Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.