Onlyfan Premium Videos

অস্তপারের সন্ধ্যাতারা


 গল্প-ঃঅস্তপারের সন্ধ্যাতারা

লেখক-ঃ আরভান শান আরাফ


মা পাঠালো এক কেজি চিনি আনতে। আমি চিনি আনতে বাজারে যাওয়ার পথে গলির মোড়ে শুভদের সাথে ক্রিকেট খেলায় মজে গিয়ে যখন বাড়ি ফিরলাম তখন চিনির কথা বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম। মা ঝাঁটা হাতে তাড়া করতে মনে পড়ল চিনির কথা। ঝাঁটার হাত থেকে বাঁচতে এক দৌড়ে চিনি নিয়ে বাড়ি আসতে খেয়াল হলো ভাংতি টাকা আনিনি। আজ আর রক্ষে নেই। 

রান্না ঘরে চিনি ভর্তি পলিথিনটা রেখে চুপিচুপি বের হয়ে যেতে ই ধরা পড়লাম গোলশানের হাতে৷ গোলশান আমাদের বাসায় কাজ করে দু বছর হল।সামনের দুটো দাঁত নেই তাই কথা বলার সময় থু থু ছিটকে বের হয়ে আসে৷ বয়স ত্রিশ বা বত্রিশ হবে৷ কিন্তু গোলশান নিজেকে সুইট সিক্সটিন ভাবতেই আনন্দ পায়। লম্বায় তিন ফুট সাত ইঞ্চি। তবে কাজে বেশ পটু। আমাকে দেখতে পেয়ে এক প্রকার আনন্দিত হয়ে ই বলল

-অ আল্লা,ভাইসাব দি এনো। কাকী আফনেরে খোঁইজ্জ্যা মরে। চিনি নি আনছেন? 

-যা ভাগ। চিনি রান্না ঘরে। 

-ক্যান, ভাগব ক্যান? 

-ধুর ছাতা। 

আমাকে আবার যেতে হবে ভাংতি আনতে৷ এদিকে টিটু স্যারের টিউশনে যেতে হবে। বই আনতে রুমে গেলে ই মার হাতে ধরা পড়ব৷ একে তো চিনি আনতে ভুলে গিয়েছি, তারুপরে গতকালকের ম্যাথ পরিক্ষায় পঞ্চাশে চার পেয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছি৷ ঝাঁটার বারি একটা ও আজ মাটিতে পড়বে না। 

আমি চুপি চুপি বিড়ালের মত হেঁটে বই নিয়ে বারান্দা হতে সাইকেল নিয়ে টিউশনের উদ্দ্যেশ্যে বের হলাম। তখন বিকেল চারটা। সারাদিন পেটে একটা দানা ও পড়েনি। খিদায় পেটে কুত্তা দৌড়াচ্ছিল। 


আমার নাম তানিম হক। বাসার সবাই টুনু, তুনু,তানু, তানিম্মা যা ইচ্ছে ডাকে৷ উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষে এসে রোজ রোজ ক্লাস টেস্টগুলোতে লাড্ডু দিয়ে প্রমাণ করে দিচ্ছি যে আমি পড়াশোনার যোগ্য নয়৷ স্যাররা সপ্তাহে দু বার বাবাকে ডেকে পাঠান। আমার বাবা এক কানে শুনে আরেক কানে বের করে বাড়ি আসে৷ রাতে খাবার টেবিলে মা যখন জিজ্ঞেস করে স্যার কী বলল তখন বাবা খুব হৃষ্টচিত্তে বলে

-তেমন কিছু না। বাদ দেও। 

সমস্যা হয় তখন যখন স্যার সরাসরি মাকে ফোন করে বলে। তখন আমার চুল আর চুল থাকে না। এই আঠারো উনিশ বছর বয়সে মায়ের হাতের যত মার খেয়েছি তার হিসেব করলে আরেকটা ক্যালকুলাসের বই

ফিলজফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথেমেটিকা হয়ে যেত। 

টিউশন শেষ করে উত্তরপাড়ার মতিনের সাথে বাড়ি ফিরছিলাম। আকাশ তখন মেঘ করেছে৷ বৃষ্টি নামি নামি করছে৷জনতা রাইস মিল ক্রস করতেই বৃষ্টি শুরু হলো। বাসায় ফিরে সাইকেলটা বারান্দায় রেখে ব্যাগটা রুমে ছুড়ে শার্টটা খোলে তারে লটকে দিয়ে এক দৌড় দিলাম মাঠের দিকে। মতিন ফুটবল নিয়ে আসতে আসতে মনে হল একবার পাশের বাসার আবির ভাইকে দেখে আসি। আহা! দু দিন হলো তাকে দেখি না৷ ইদানীং তাকে না দেখলে মন কেমন অস্থির অস্থির করে। আমার মনে হয় আমি তাকে ভালবাসি। ছেলে হয়ে ছেলেকে ভালবাসি? ছি ছি, এই কথা কীভাবে বলি। 

আসলে ভদ্রলোক সম্পর্কে আমার কি হন তার খবর জানা নেই। সবাই ভাই ডাকে, আমি ও ডাকি। ওনার বয়স ত্রিশ পেরিয়ে পঁয়ত্রিশ। ঢাকায় বিশাল ব্যবসা ওনার৷ সপ্তাহে দু দিন গ্রামে আসেন নিরিবিলি সময় কাটাতে৷ ওনার নীল রঙের খুব সুন্দর একটা গাড়ি আছে। 

ওনি যখন গাড়ি থেকে নামেন তখন আমি আমাদের ছাদ থেকে ওনাকে দেখি। গ্রামে ওনার যে ব্যবসা তার দেখাশোনা আমার বাবা করেন। সেই সুবাদে প্রায় আমাদের বাসায় আসেন। আমার বাবা ওনাকে ভাই ডাকে৷ যদি ও বাবার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। 


আজ শনিবার, তারমানে আবির ভাই বাড়িতেই আছেন৷ বৃষ্টি হচ্ছে, ওনার তো বৃষ্টি হলেই ছাদে আসার কথা৷ অথবা ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী পড়ে বারান্দায় বসে চা খাওয়ার কথা। আজ কি আসেনি? 

আমি কয়েকবার উঁকি দিয়ে দেখলাম গাড়িটা আছে কি না৷ নাহ,গাড়িটা ও নেই। তারমানে আসেনি। মন খারাপ হয়ে গেল। 

ফুটবল খেলতে মাঠে না গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই মা খ্যাক করে উঠল

-কিরে,তর কি নাওয়া খাওয়া নাই? সারাদিন ছদকার ছাগলের মত ঘুরাঘুরি। অংকে পেলি চাইর। আজ আসুক তর বাপ। 

আমি প্রতিউত্তরে কিছু না বলে কল তলায় চলে গেলাম। রাজ্যের হাড়ি পাতিল দেখে মাথা গরম হয়ে গেল। পেটের খিদার চেয়ে মনের খিদা তখন ভয়াবহ। রাগে সজোরে হাড়ি পাতিলে লাথি মেরে ঝিম ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম৷ পিছন দিকে ক্ষুধার্ত বাঘিনির মত মা এসে ধপাস করে পিঠে চর কষতেই হুশ এলো। আমি আবার রাগে সব সব কিছুতে লাথি মেরে হনহন করে বের হয়ে এলাম। খানিক সময়ের জন্য নিজেকে খুব তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। কি করব আমি? 

আবির ভাইকে আমি প্রথম দেখেছিলাম তিন বছর আগে। তখন আমি ক্লাস টেনে পড়ি। সবে দাড়ি গোঁফ উকি দিয়েছে৷ একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আম খাচ্ছিলাম৷ তখন দৃষ্টি আটকে গেল নীল রঙের গাড়িটার দিকে৷ অবাক হয়ে দেখছিলাম সুন্দর গাড়িটা৷ হঠাৎ খেয়াল হলো বারান্দায় কেউ একজন দাঁড়িয়ে৷ আমি অবাক হলাম। পুরুষ মানুষ এত সুন্দর। তার লোমশ শরীর। যেন সকালে ফোটা কোন ফুল৷ তার চোখ, যেন জলে ভাসা পদ্ম জোড়া৷ বড় অদ্ভুত সুন্দর পুরুষ। সেদিন ই তাকে দেখে মুগ্ধ হয়৷ এর পর প্রতি শুক্র আর শনিবার আমার রুটিন হয়ে যেত তাকে দেখা। মাঝখানে তিনটা বছর৷ কত বার, কত বাহানায় তার কাছে গিয়েছি কিন্তু কথা বলতে পারিনি৷ একবার ছোঁয়ে ও দেখিনি।আমার রাত কাটে তার কথা ভেবে, দিন কাটে তার খেয়ালে। এ বড় অদ্ভুদ প্রেম। 

এমন প্রেমের কথা কাউকে বলা যায় না। ছেলে হয়ে একটা ছেলেকে ভালবাসার কথা কীভাবে বলব? লোকে বলবে কী? আবির ভাই শুনলে ভাববে কি? 


বৃষ্টি থেমে গেছে। সন্ধ্যা হয় হয় করছে অথবা সন্ধ্যা কবে ই হয়ে গেছে৷ আমি মঞ্জু মিয়ার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বান রুটি আর কলা খেয়ে পেটটাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলাম ঠিক সেই সময় নীল রঙের গাড়িটা আমার সামনে দিয়ে অতিক্রম করল। বুকটা কেঁপে উঠল। সে এসেছে ভাবতেই হৃদয়টা আনন্দে কেমন করে উঠলো। আমি সারাদিনের সকল ক্লান্তি ভুলে এক দৌড়ে বাড়ি গিয়ে ছাদে উঠলাম। আমি ছাদে উঠার সাথে সাথে গাড়িটা গেইটের ভেতরে ঢুকে থামলো। আমি পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। আবির ভাই গাড়ি থেকে নেমে সবার আগে ছাদের দিকে তাকালো। আমাকে দেখে মুচকি হেসে মাথা নামিয়ে নিল কিন্তু আমি নামায়নি৷ আজ তাকে মন ভরে দেখতে হবে। অনেক দিন পর দেখেছি। কিন্তু সে কি আমাকে দেখেছে? সে কি আমায় দেখে হেসেছে? কী হচ্ছে আমার? বুকটা ধুকধুক করতে লাগলো। মনে হলো আশেপাশের সবাই জেনে যাচ্ছে সব৷ আমার বুকের ধুকধুক শব্দ ও সবাই শুনতে পাচ্ছে। আমি বুক চেপে নিচে নেমে এলাম। 


রাতে মা ভাত খাওয়ার সময় শরীরে হাত দিয়ে আৎকে উঠে বলল

-এ কি টুনু,শরীর যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। হায় কপাল!  এই ছেলে এমন দেওয়ের মত কেন চলে? 

-কেন মা? 

-এত জ্বর আর তুই সারাদিন না খেয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ঘুরে বেড়িয়েছিস? কবে বুঝবি তুই? 

-ধুর!  এমন জ্বর আমার সারাক্ষণ ই থাকে। 

মা অবাক হয়ে বলল

-সারাক্ষণ মানে? 

আমি কিছু না বলে প্লেটে হাত ধুয়ে উঠে গেলাম। খেতে একদম ইচ্ছে করছিল না। মাথাটায় যন্ত্রনা হচ্ছিল।সাথে মনে হচ্ছিল শরীরের হাড়গুলো ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে কেউ। 


সকালে খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল৷ ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে খালি গায়ে ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। সকালের শীতল বাতাসে বুকের পশম গুলো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে এমন অবস্থা। আমি পাশের বাসায় খেয়াল করে দেখছিলাম আবির ভাই জেগেছে কিনা৷ চোখ আটকে গেল ওনাকে দেখে। তোয়ালে গলায় জড়িয়ে তিনি আঙ্গিনার ফুল গাছগুলোর আগাছা পরিষ্কার করছিল৷ সকালের অল্প রোদে ওনার শরীর ঘেমে আছে৷ সেখানে আলো পরে মতির মত চিকচিক করছিল৷ আমি যখন মুগ্ধ হয়ে তাকে দেখছিলাম তখন খানিক পর পর সে ও কিঞ্চিৎ তাকাচ্ছিল৷ সে যতবার তাকাচ্ছিল ততবার আমার সারা শরীর কাটা দিয়ে উঠত৷ মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ওনি সব বুঝে যাবেন৷ এই বুঝি সবাইকে ডেকে বলে দিবে৷ আবার ভাল ও লাগছিল। মনে হচ্ছিল, তার দৃষ্টিতে আমি পড়েছি৷ আমার মত সে ও হয়তো আমাকে চায়৷ অনেকটা না হোক, অল্প হলে ও চায়।


শরীরে একদম শক্তি পাচ্ছি না৷ রাতে জ্বর আসে, দিনে দুর্বল লাগে। অথচ আগে কেমন বলটা নিয়ে সাই করে দৌড় দিলে কারো সাধ্য ছিল না আমাকে আটকানোর৷ ইদানীং একটু খেলতেই হাঁপিয়ে যাচ্ছি। সারাক্ষণ ক্লান্ত হয়ে থাকি। রাতে ঘুম হয় না অথচ দিনে ঘুম ঘুম ভাব কমে না। মাকে বললে মা চিন্তা করবে তাই বলিনি। বন্ধুরা বলে আমি নাকি শুকিয়ে যাচ্ছি। আগে যে খুব স্বাস্থবান ছিলাম তা নয়।

সেদিন হঠাৎ করে ই মাথা ঘুরে কল তলায় পড়ে যায়৷ গোলশান তখন থালা বাসন নিয়ে বসেছিল৷ আমাকে ধপাস করে মাটিতে পড়তে দেখে সে যখন চিৎকার করে বলছিল

-অ আল্লা, ভায়ের কি হয়ছে? সবাই জুলদি আইন৷ 

সেটা ই কানে ঢুকেছিল। বাকি শব্দ আর মনে নেই  বা শুনি ই নি। 

হাসপাতালে গিয়েছিলাম বুধবার। আজ শনিবার। একের পর এক পরিক্ষা করিয়ে ডক্টর মা বাবাকে কী বলল আমি শুনিনি৷ তবে মায়ের লাল চোখ, বাবার বিষণ্ণ চেহারা দেখে ভয় পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে আজ যদি হাসপাতাল থেকে ছাড়া না পায় তবে আবির ভাইকে দেখতে পাব না।চিন্তায় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল৷ 

প্রায় দু সপ্তাহ আমাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছিল। আবির ভাইকে দেখতে না পেয়ে দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার উপক্রম। বাড়ি ফেরার পর শরীরে আগের মত শক্তি পাচ্ছিলাম না৷ ডক্টর বাবা মাকে কি বলল তা ও জানি না। তবে মনে হয় আমার বড় কিছু হয়েছে। 


সেদিন বিকেলে শরীররা যেন হুট করেই ভাল হয়ে গেল।দু দিন ধরে রুম থেকে বের না হতে পেরে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আমি বিছানা থেকে উঠে ড্রয়িং রুমে টিভি ছেড়ে কি একটা হিন্দি সিনেমা দেখছিলাম। ঠিক সেই সময় গোলশান ঝাড়ু হাতে এসে বলল

-ভাইজান, ঐ বাড়ির বড়লোক বেডায় আয়ছে। 

আমি ত্যাক্ত হয়ে বললাম

-তো আমি কি করব? যা এখান থেকে

-নাহ, যামু না। কিতা করবেইন? 

আমি রিমোট ছুড়ে মারতেই খেয়াল হল দরজায় আবির ভাই দাঁড়িয়ে। তার পেছনে আরো দুজন। রিমোট গিয়ে তার পায়ের কাছে পড়ল

আমি বিস্ময়ে হা করে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। সে মুচকি হেসে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল

-কেমন আছো তানিম?

আমি খালি গায়ে বসে ছিলাম। লজ্জায় গিরগিটির মত রঙ পালটে কিছু বলতে যাব ঠিক তখন মঞ্চে আমার মাতা জননীর প্রবেশ। তিনি খুশিতে আটখানা হয়ে গেল।

আবির ভাই এসে সোফায় বসল। তার সাথে দুজন লোক। আমার দিকে আবার তাকিয়ে বলল

-কেমন আছো তুমি? শরীর কেমন

আমি তার দিকে তাকিয়ে থেকে মাথা হেলিয়ে উত্তর দিলাম।  

সে ঠিক আমার মুখোমুখি বসা।আমার বুকের ধুকপুক শব্দটা যেন বেড়ে যাচ্ছিল। এই প্রথম সে আমার এত কাছে৷ এর আগে যতবার দেখেছি ততবার দূর থেকে ই। 


সেদিন আবির ভাইয়ের সাথে আমার তেমন কথা হয়নি৷ আমি অসুস্থ্য তাই দেখতে এসেছিল।এটা কি ভালবাসা নাকি প্রতিবেশীর দায়িত্ব পালন? সে কি আমাকে নিয়ে ভাবে নাকি ভাবে না? এসব ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম হতো না। দিন দিন শরীর খারাপ হচ্ছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না আমার হয়েছে কি। 


সামনে পরিক্ষা৷ এখন আর কেউ কলেজে যেতে বলে না। কিন্তু আমি রোজ যাচ্ছি৷ ক্লাসে কি পড়াচ্ছে তা বুঝে আসে না৷ক্লাস টেস্টে মাঝে মধ্যেই ফেইল করছি।আগে স্যারেরা কত কিছু বলত এখন সবাই যেন অতিরিক্ত মায়া দেখাচ্ছে। বিষয়গুলো একদম ভাল লাগছিল না৷ বিরক্ত লাগছিল সব কিছু৷ কি হয়েছে আমার? কেন সবাই এমন করে? 

ঐদিন সন্ধ্যায় রুমে শুয়ে শুয়ে জীব বিজ্ঞান বইটা পড়ছিলাম। বসে পড়তে ক্লান্ত লাগে। ঠিক সেই সময় ভারী কন্ঠে দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে বলল

-আসব ভেতরে? 

আমি বই থেকে মাথা তুলিনি কিন্তু আমার বুকের ধুকপুক শব্দটা অকারণে ই বেড়ে গেল। আমি বই থেকে মাথা তুলে দেখি আবির ভাই। সে আজ আমার ঘরে? স্বপ্ন নয় তো? আজ তো বুধবার৷ বুধবার তো ওনি আসেন না৷ আমি শোয়া থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে পাশে রাখা তোয়ালেটা টেনে শরীরে দিয়ে বললাম

-জ্বি জ্বি৷ আসুন 

সে এসে আমার পাশে দাঁড়ালো। তার শরীর থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ ভেসে আসছে। আমি লজ্জায় তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। কিন্তু আজ সে চোখ ফেরায়নি৷ তাকিয়ে ই ছিল অপলকে।আমার সারা শরীর দিয়ে শীতল রক্তস্রোত বয়ে যাচ্ছিল। ইচ্ছে করছিল এখন একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলি। ইচ্ছে করছিল তার সুন্দর ঠোঁট দুটিতে চুমু খেতে, তার শরীরে লেপ্টে যেতে। আরো ভয়ানক কিছু ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কিছুই সম্ভব হচ্ছিল না। সে কথা বলল

-আজ তাকাবে না? অন্য সময় তো দৃষ্টি সরাতে না৷

-আপনি কেমন আছেন? 

-তুমি ভাল থাকলে আমি ও ভাল থাকি 

-সেটা কেন? 

-সেটা বুঝো না? 

আমি তার দিকে তাকালাম। তার চোখের কোণে পানি।তার চোখ আর আমার চোখ যখন একি সরল রেখায় তখন ঘটল সে ভয়ানক ঘটনা। সে আমার ঠোঁটে চুমু খেল। আমার সারা শরীর ঝনঝন করে উঠলো।আমি চোখ বন্ধ করে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম৷ উভয়ের নিশ্বাস মিলে মিশে একাকার৷ শুধু চুম্মন আর ঘন নিশ্বাসের শব্দ। 

আমি মাতালের মত তার ঠোট জোড়া কামড়ে ধরলাম৷ তারপর এক সময় উভয় শান্ত হয়ে গেলাম৷ সে হনহন করে বেড়িয়ে গেল। 

আমি সুখের উত্তাপে, এত দিনকার ভালবাসার মানুষটাকে কাছে পেয়ে কী করব বুঝে আসছিল না৷ ইচ্ছে করছিল সবাইকে চিৎকার করে বলি। কিন্তু এ কথা তো বলা যায় না। 


এর পরের দিন শুনলাম আমার অসুস্থ্যতার কথাটা৷ আমার লিউকেমিয়া।গোলশান যখন চোখের পানি মুছতে মুছতে বলছিল

-ডাক্তার কয়ছে, আফনের লুকিয়াম হয়ছে।

তখনো বুঝিনি অসুগটা কি। রাতে বিছানায় ছটফট করতে করতে যখন ভাবছিলাম গোলশানের বলা লুকিয়াম অসুখটার কথা, তখন মনে হচ্ছিল, আমার হয়ত লিউকেমিয়া। সকালে মাকে জেরা করতেই নিশ্চিত হয়ে গেলাম। 

মনে হচ্ছিল আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে৷ ভেতরটাতে অদ্ভুত জ্বালা হচ্ছিল। এ কেমন কথা? আমার ক্যান্সার!!  আমি মারা যাব? আবির ভাইকে ছেড়ে চলে যেতে হবে?সবে তো আমি তার স্পর্শ পেয়েছিলাম। এখনি ছেড়ে যেতে হবে? 


দিন দিন আরো দুর্বল হয়ে যাচ্ছিলাম। শরীর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যাচ্ছিল। আমার হাত ধরে আবির ভাই বসে আছে। ওনি টুকটাক কথা বলছিল৷ কিন্তু আমার মুখ দিয়ে কোন কথা নেই৷ আমার চোখ জুড়ে আমার সুখের শৈশব৷ আমার স্কুল,কলেজ,খেলার মাঠ,নদীর পাড়, পুকুর আর কাশবন৷আবির ভাইয়ের ঝাঁকিতে হুঁশ ফিরে এলো। আমি তার দিকে তাকালাম-তার চোখ তখন জলে ছল ছল করছে। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে সে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে কপালে চুমু খেয়ে বলল

-তোমায় ভালবাসি৷ আমি থাকতে তোমার কিছু হবে না৷ হতে ও পারে না। কিছুদিনের মধ্যে ই আমরা সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। 

আমি তার কথায় ঠিক সাহস পাচ্ছিলাম না। এত খরচ দিয়ে সিঙ্গাপুর গিয়ে যদি বেঁচে না ফিরি? মৃত্যুতে ভয় নেই, ভয় আমার বাবা-মাকে নিয়ে৷ তাদের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না৷ আরো ভয় আবির ভাইকে হারানো নিয়ে৷ মৃত্যু সব শেষ করে দিবে। 

এক সপ্তাহ পর আমরা ঠিক ই সিঙ্গাপুর পাড়ি দেয়। মা,বাবা,আর আমি। আমি চাচ্ছিলাম না আবির ভাই আসুক৷ তার সামনে আমার মৃত্যু হোক সেটা আমি চাচ্ছিলাম না। 


দেখতে দেখতে ছয়টা মাস চলে গেছে৷ আমি ক্যান্সার জয় করে দেশে ফিরছে৷ এই ছয় মাস আবির সারাক্ষণ বাবা মার সাথে কথা বলেছে৷ শুধু আমার সাথে বলেনি।আজ বাড়ি ফিরে কেমন দেখব তাকে? সব কিছু আগের মত আছে তো? সে আমায় ভালবেসে বুকে টেনে নিবে তো? নাকি আমার শুকনো লিকলিকে শরীর, মাথার পাতলা চুল আর ফ্যাকাশে চেহারা দেখে দূরে সরে যাবে?আনন্দ আর ভয় মিশে আমার বুক তখন ধুকপুক করছিল।

বাসায় ফেরার দিন তার দেখা পায়নি৷ আমাকে দেখতে সারা গ্রামের মানুষ ভিড় করেছে কিন্তু সে আসেনি। সন্ধ্যার দিকে আমি ছাদে গেলাম৷ ছাদ হতে তার বাড়ির দিকে তাকাতে ই খেয়াল করলাম সারা বাড়ি আলোতে ঝলমল করছে৷ আমার হৃদয় মোচড় দিয়ে উঠল। আমি উন্মাদের মত দৌড়ে নিচে গেলাম।

তার বাসার গেইট খোলা৷ভেতরে ঢুকতেই সব লাইট অফ হয়ে গেল৷ অন্ধকারে আমি এক পা আগাতেই কেউ হাত টেনে ধরল আর সাথে সাথে সারা বাড়ি আলোয় আলোকিত হয়ে গেল৷ আমি মুগ্ধ হয়ে তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম৷ সে আমায় পাগলের মত চুমু খেতে খেতে বলছিল

-বলেছিলাম না, যেদিন তুমি ফিরবে সেদিন আলোয় আলোয় এ বাড়ি সাজাব । 

আমি বুকে মাথা রেখে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছিলাম। এবার মারা গেলে ও তৃপ্ত। আমি তাকে পেয়েছি, যার ভালবাসায় আমার সমগ্র জীবন কাটাতে চাই। 

......(সমাপ্ত)...



অস্তপারের সন্ধ্যাতারা অস্তপারের সন্ধ্যাতারা Reviewed by সমপ্রেমের গল্প on October 27, 2021 Rating: 5

2 comments:

  1. আপনার সব গল্প পড়ি৷ আমি আপনার খুবই বড় ভক্ত।। আপনার লেখা খুবই ভাল লাগে।।চালিয়ে যান।আল্লাহ আপনার হায়াত বাড়িয়ে দেক।

    ReplyDelete
  2. শুধু আমি পাইনি তাকে যাকে আমি প্রতিটা মুহুর্ত চেয়েছি।

    ReplyDelete

Powered by Blogger.