Onlyfan Premium Videos

শূণ্যস্থান-২

                         শূণ্যস্থান-২
                     আরভান শান আরাফ

গ্রামের নাম মুকুন্দপুর। চারদিকে মেঘনা। মাঝখানের চরে জেগে উঠেছে গ্রাম৷ আধুনিক সুবিধা বঞ্জিত এলাকা। বিদ্যুৎ নাই, বাজার নাই। বাজারের জন্য যেতে হয় নদীর ঐ পাড়ের গোসাইপুরে৷ সেখানে ও সব কিছু পাওয়া যায় না। বোর্ড অফিসের বাজারে যেতে হয়। সেখানে একটা হাসপাতাল আছে। পঁচিশটা বেড। দুইজন ডাক্তার৷ সাতজন সহকর্মী।স্কুল আছে। একটা প্রাইমারি আরেকটা হাই স্কুল।গ্রামের ছেলে মেয়ের এর চেয়ে বেশি পড়ার সুযোগ হয় না। এইবার বোর্ড পরিক্ষায় বসেছে মোটের উপর বারোজন। একজন মেয়ে। নাম কইতরী। তার বাড়ি মুকুন্দপুর। কইতরী মুকুন্দপুর গ্রাম প্রধানের মেয়ে।সৌন্দর্যে চোখে ধাধা লেগে যায়৷ মেধাবী।
কইতরীর খুব ইচ্ছা শহরে গিয়ে কলেজে পড়ার৷ কিন্তু তার বাপজানে রাজি হবে না। মাইয়া বড় হয়ছে। মাইয়ার বিয়া দেওয়া লাগব। মা মরা মাইয়া। সে প্রায় লজিং মাস্টার ও বোর্ড অফিসের হেডমাস্টার নিবিড়ের সাথে আলাপ করে। কী করবে মাইয়ারে নিয়া৷ নিবিড় এলাকায় আসছে দু বছর হল। এই দুইবছরে ই সে স্কুলের আর এলাকার চেহারা পাল্টে  দিয়েছে। বোর্ড অফিস,গোসাইপুর,মুকুন্দপুরের মানুজন তাকে দেবতা তুল্য সম্মান করে৷ পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের ছেলে, দেখতে রাজপুত্রের মত, স্কুলের হেডমাস্টার,তারুপরে চমৎকার স্বভাব চরিত্র। যে কেউ অবাক হয় দেখে। এলাকার সবাই তারে যুবা মাস্টর ডাকে। নিবিড় নিজে ও ভুলে গেছে যে তার একটা নাম ছিল। সে ও নিজেকে যুবা মাস্টর বলতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
নিবিড় মুকুন্দপুর গ্রামে থাকে। নদীর পাশে ছোট একটা ছন দিয়ে বাধা ঘর।ভেতরটা বেশ গোছানো। আধুনিক কালের কর্টেজগুলোর মত।ছোট একটা খাট।তাতে ফুলের নকশা করা।চরে গাছপালা তেমন নেই। কিছু নারিকেল গাছ আর তরমুজ। দু একটা দোকান আছে৷ সেখানে সারাদিন ট্যাপ বাজে।অদ্ভুত অদ্ভুত কিছু গান।
নিবিড়ের ছোট কুড়ে ঘরটার বা দিকে কাঠের তক্তা আর গাছের ডাল দিয়ে বুকসেলফের মত করে সাজানো। সেখানে অনেকগুলো বই রাখা।দুইটা ছোট ছোট টুল। একটাতে একটা ল্যাম্প আরেকটাতে পানি খাওয়ার জগ। সে খাবার খায় কইতরীদের বাসায়। কইতরীর আপন মা নেই৷ দুইজন সৎ মা।তারা কইতরীকে অনেক আদর করে। না করে ও উপায় নেই৷ কইতরীর বাবা মেয়ের অযত্ন একদম মেনে নিতে পারেন না।সেই ভয়ে কইতরীর দুই মা সারাক্ষণ কইতরী কইতরী করে মরে।
বাসায় ফিরতে ফিরতে নিবিড়ের সন্ধ্যা৷ সন্ধ্যা মানে এই চরাঞ্চলে রাত।সে গিয়েছিল গোসাইপুর। শহর থেকে কিছু বই আনিয়েছে৷ এই অঞ্চলে বই পাওয়া দুষ্কর।
বইগুলো চৌকিতে রেখে কাপড় ছাড়তে ছাড়তে হঠাৎ করেই তার দু চোখ ভিজে উঠল৷
ইদানিং প্রায় এমন হয়৷ অকারণেই বুক ফেটে কান্নার ঢেউ উঠে৷ কিছু কথা,কিছু ব্যথা হৃদয়টা এলোমেলো করে দেয়।নিবিড় বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল৷ তার মনে হল সে খুব একা।
মা বাবা মারা যাওয়ার পর মামার পরিবারের বড় হয়েছে সে।যত্নের বদলে তাচ্ছিল্য ই বেশি পেয়েছিল। একটু ভালবাসা, একটু যত্ন, আদর করা অথবা খেয়াল রাখার মত তেমন কেউ ছিল না। সতেরো আঠারো বছর বয়সে যখন সুমনের সাথে পরিচয় তখন তার মনে হয়েছিল যে, সে সুখি৷ এইবার সুখ ধরা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুখ টিকেনি৷ টিকেনে বলেই আজ নিবিড় এতগুলা রক্তের সম্পর্কহীন মানুষের সাথে বেঁচে থাকার লড়ায়ে ব্যস্ত।
নিবিড় কাপড় ছেড়ে পায়জামাটা পড়ে বাহিরে বের হয়ে এল। জায়গাটা বেশ নিরব৷ একটু দূরেই নদী। সেখান থেকে ঢেউয়ের শব্দ আসছে। বাতাস সেই শব্দ মিশে অপুর্ব সংগীত সৃষ্টি করে৷ নিবিড় মুগ্ধ হয়ে শুনে সেই শব্দ৷ মাঝে মাঝে শেয়াল ডাকে। শেয়ালের কন্ঠে আর্তনাদ। নিবিড়ের ভেতরে ও তেমন একটা শব্দ তৈরি হয়। সেটা কষ্টের শব্দ। হৃদয়ের পাড় ভাঙ্গার শব্দ। নিবিড় বেঁচে থাকার জন্য সারাদিন শতভাবে ব্যস্ত থাকে৷ কিন্তু যখন ই রাত হয় তখন ই তার বুক ফেটে কষ্টের ফোয়ারা নামে।

অহনা গোসল সেরে বের হতেই দেখল জাবের গভীর ঘুমে। জাবেরের পোস্টিং হয়েছে এই অঞ্চলে।তার একা আসার ই কথা ছিল, কিন্তু অহনা ছাড়েনি। ওর শরীররা বেশি ভাল নেই। ডাক্তার মানুষ।ঠিকমত খাবার খাওয়া, রুটিন অনুযায়ী চলাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জাবের তা করে না। ফলস্বরূপ অহনার আসতে হয়।
হাসপাতালটা ছোট। এলাকাটা বোর্ড অফিস নামে পরিচিত৷ চারজন নার্স,একজন ওয়ার্ড মাস্টার,একজন আয়া আর দু জন ডাক্তার ছিল এতিদিন৷ নানান কারন দেখিয়ে একজন চলে যাওয়ার কারনে জাবেরের পোস্টিং৷ আজ জাবের জয়েন করবে।অহনা সকাল থেকে তাকে টানা ডেকে যাচ্ছে৷ কিন্তু জাবের কুম্ভ কর্ণের মত ঘুমাচ্ছে তো ঘুমাচ্ছেই।

হাসপাতালে নতুন ডাক্তার আসবে শুনে নিবিড় কিছুটা স্থির হল। দুদিন যাবত চিন্তায় অস্থির হয়ে ছিল সে। এতগুলা রোগী একজন ডাক্তারের পক্ষে দেখা সম্ভব না।তারুপরে আবাহাওয়া পরিবর্তনের ফলে গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারা নানান সংক্রামক রোগে বিপর্যস্ত। নিবিড় ভেবেছিল দুপুরের দিকে একবার নতুন ডাক্তারকে দেখতে যাবে কিন্তু হঠাৎ করেই মুখন্দপুরের দুই ভাইয়ের মধ্যে জমি জমার জের ধরে ঝামেলা লেগে যাওয়াতে স্কুল থেকে সেখানে চলে যেতে হয়েছিল। ঝামেলা মিটতে মিটতে বেলা পড়ন্ত। গোসল দিয়ে খেতে বসার সময় শুনলো নতুন ডাক্তারের বিবরণ। স্ত্রীসহ এসেছেন তিনি। বাচ্চা কাচ্চা নেই।লম্বা চৌড়া ডাক্তার। মুখের ভাষা অতি মধুর৷ পুরানো ডাক্তারের মত না।নিবিড় আশ্বস্ত হল।
এলাকার মানুষগুলোর জন্য তার খুব মায়া হয়। সব কিছুতেই তারা পিছিয়ে। এইবার যদি কিছুটা সামনের দিকে আগাতে পারে।নিবিড় যতদিন আছে এলাকার উন্নতি নিয়েই ভাবছে৷

সুমন ঘুম থেকে জেগেই দেখে তার চোখ ভেজা। সে কি স্বপ্নে কেঁদেছিল? মনে পড়ছে না। তবে মনটা অস্থির হয়ে আছে।নিবিড়ের কথা মনে পড়ছে। সুমন তার বুকের বাম পাশে হাত রাখল। নিবিড় প্রায় তার বুকে হাত রেখে বলত
-এইখানে আমি থাকি?
সুমন নিবিড়ের কপালে চুমু খেয়ে বলত
-হুম,এইখানে আমার কলিজা থাকে।
নিবিড় আনন্দে জড়িয়ে ধরত।
সেই দিনগুলো, সেই নিবিড় হারিয়ে গেছে। সুমনের বুকে কেবল শূণ্যতা। ভয়ানক শূণ্যতায় ভরে গেছে সুমনের জীবন।
খাবার টেবিলে সুমন চুপচাপ ই ছিল। কথা বলল মিতু
-জাবেরের ট্রান্সফার হয়েছে, শুনেছো?
-না তো। কবে হল?
-দিন পাঁচেক।
-কোথায়?
-নাম জানি না। তবে গ্রামাঞ্চলে। অহনা সাথেই।
-ও গেল কেন?
-তা তো জানি না। তুমি কল দিও তো একবার মনে করে।
-দিব।
সুমন উঠে গেল।অহনা খাবার প্লেটে কিছুক্ষণ আঙ্গুলগুলি নাড়াচাড়া করে উঠে গেল।জীবনে সে সুখ চেয়েছিল কিন্তু আজ এই চাপা কষ্ট নিয়ে তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

নিবিড় নদীর পাড়ের নৌকার গলুইয়ে বসে বসে বই পড়ছিল। হঠাৎ ঐ পাড় থেকে কারো আওয়াজ আসল।নিবিড় বই থেকে মাথা তুলে ঐপাড়ে তাকাতেই খেয়াল করল জনৈক ভদ্রলোক তাকে ডাকছে। হয়তো এইপাড়ে আসার জন্য, ঘাটে ভিন্ন কোন নৌকা ও নেই৷ খেয়া পারাপার বন্ধ। নিবিড় নৌকা ঐ পাড়ে নিয়ে গেল। ভাল করে খেয়াল করতেই বুঝল এটা নতুন ডাক্তার সাহেব৷
-স্লামুয়ালাইকুম ডাক্তার স্যার।
-আপনি যুবা মাস্টার?
নিবিড় মুচকি হেসে সম্মতি দিল।
-উঠেন।
জাবের নৌকাতে উঠে বসল।নিবিড় বৈঠা হাতে নৌকা বায়তে লাগল৷ নৌকায় দুজন ই নিরব ছিল। ঘাটে নামার আগে জাবের বলল
- এলাকার লোকজনের মুখে তো কেবল আপনার নাম ই শুনি
নিবিড় আবারো মুচকি হাসলো। নিবিড়ের হাসি দেখে জাবের বলল
-আপনার হাসি খুব সুন্দর। আমার স্ত্রী এমন হাসি খুব পছন্দ করে।
-হাসির রূপভেদ আছে নাকি?
-আছে বৈকি, অবশ্যই আছে। সেটা আমার স্ত্রী সবচেয়ে ভাল বুঝে।আসুন না একদিন।
-আসাটা অবশ্যই উচিত। আসব একদিন। তা এখন কোথায় যাচ্ছেন?
-মুখন্দপুর গ্রাম প্রধানের বাড়ি।
-কীসের জন্য?
-চলুন। গেলেই বুঝবেন।
নিবিড় অবাক হল। সে ডাক্তার জাবেরকে অনুসরণ করল৷ সে ভেবে পাচ্ছিল না, জাবের সাহেব পূর্ব এই অঞ্চলে এসেছিলেন কি না।

অহনা সকাল থেকে বিষণ্ণ।তার ঢাকা ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু জাবের সেই বিষয়ে উদাসীন। কিছুক্ষণ আগে বের হয়ে গেছে৷ ফিরবে সন্ধ্যায়। অহনা একা একা থাকবে। যেটা ওর ভাল লাগে না একদম। নয়টার দিকে সুমনে কল করেছিল অনিচ্ছার পরে ও কথা বলেছে। ভাইয়ের বিষণ্ণ কন্ঠস্বর তাকে আরো বিষণ্ণ করে দিয়েছে। আচ্ছা, এমনটা হতে পারে না যে, নিবিড় আবার তাদের জীবনে ফিরে আসবে৷ আবার আনন্দে ভরে উঠবে তাদের জীবন। অহনার চোখ ভিজে উঠে৷

সন্ধ্যার দিকে নিবিড় নিজের ঘরে ফিরল। বাতি জ্বালিয়ে হাতে রাখা বইটা টেবিলের উপর রাখতে রাখতে চোখ মুছলো।তার ভেতরটায় এখন ভয়ানক ঝড় বয়ে চলছে। যাদের কাছ থেকে এতদিন সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে আজ তারা তার সম্মোখে। বিকেলের দিকে যখন সে জাবেরের সাথে তার বাসায় গিয়েছিল তখন সে বিস্ময়ে হতভাগ হয়ে খেয়াল করল যে, জানালায় যে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে সেটা অহনা। সুমনের বোন। সে আর ভেতরে যাইনি। পরিচিত হওয়ার আগেই সে দৌড়ে চলে এসেছে৷ যা ভেসে গেছে, বিলিন হয়ে গেছে তাতে আর সে মিশতে চায় না।

সুমনের সাথে পরিচয় হওয়ার আগে, অহনা নিবিড়ের কান পঁচিয়ে দিয়েছিল তার ভাইয়ের প্রসংশা করতে করতে। তার ভাই এমন, তার ভাই ওমন। তা শুনে শুনে নিবিড় মুগ্ধ হয়ে যেত। একটা সময় ভাগ্য ই তাদের মিলিয়ে দিয়েছিল। সেইদিনের রিক্সা উলটে যাওয়ার ফলে, জীবন এমন উলটে যাবে তা নিবিড় ভাবেনি। প্রেমে পড়েছিল সে সুমনের। যখন দেখা হত, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত। সেইবার বিকেলে, যেদিন পুরানো শ্মাশান ঘাটের নদীর তীরে বসে সুমন নিবিড়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল
-তোমাকে ভাল লাগে।
নিবিড় লজ্জায় লাল হয়ে বলেছিল
-কেমন ভাল লাগে?
-তুমি বুঝো না?
-না,বুঝিয়ে দেন।
সুমন নিবিড়ের হাতটা টেনে তার বুকের উপরে রেখে বলেছিল
-তুমি বুঝে নাও।
নিবিড় বুঝে নিয়েছিল। সেই ভালবাসায় সে তার সর্বস্ব সঁপে দিয়েছিল সুমনের চরণে। ফলস্বরূপ,আজকে তার এই নরক ভোগ।
নিবিড় গ্লাস থেকে এক শ্বাসে পানি খেয়ে ঘর ছেড়ে বাহিরে চলে আসল৷ কোন একটা কাজে তাকে ব্যস্ত থাকতে হবে। তাতে হয়ত, সে ভুলে থাকবে সব। বাহিরে দুইটা শেয়াল দাঁড়িয়ে ছিল। নিবিড়কে দেখতে পেয়ে তারা দৌড়ে চলে গেল। নিবিড় শেয়ালগুলোর যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে রইল। আজকে, এত দিন পর, অনেক কষ্টে মানসিক সেই ভয়ানক যন্ত্রনা থেকে বের হওয়ার পর আজ তার একি রকম কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে সে আগের মত উন্মাদ হয়ে গেছে। নিবিড় দ্রুত ভুলতে চাচ্ছে সব।

সারারাত নিবিড় বাহিরে জেগে ছিল। শেষ রাতে অনেকগুলো শিয়াল যখন একসাথে ডাকছিল তখন নিবিড়ের বুক ফাটা আর্তনাদ চরের বালুভূমিতে প্রতিধবনিত হচ্ছিল। সেই কষ্ট, সেই যন্ত্রনা, যা ভুলার জন্য নিবিড়ের সব ছেড়ে দেওয়া তা আবার ফিরে আসছে।
নিবিড় ঘরের বাহিরের টুলে বসে ভোর দেখছিল। ঠিক সেই সময় কইতরী এসে পাশে দাঁড়াল। নিবিড় খেয়াল করেনি৷ হুশ এল কইতরীর প্রশ্নে
-স্যারের কিতা শইল হারাপ?
নিবিড় চট করে নিজেকে সামলে নিল। মুচকি হাসার চেষ্টা করে বলল
-না তো।
-আফনের চোক মুক লাল হয়া লইছে।রাইতে কিতা ঘুমান নাই?
-ঘুমিয়েছি। তুমি যাও, বই নিয়ে বসো।
কইতরী সাথে সাথে চলে যায়নি। দুই তিন মিনিট অপেক্ষা করে তারপর গেল।যুবা মাস্টরকে এমনভাবে সে আগে কখনো দেখেনি। মানুষটার জন্য তার বড্ড মায়া হয়।তার চোখে পানি এসে গেছে। সে পানি লুকাতে চলে গেল। নিবিড় আরো কিছুক্ষণ বসে নদীর দিকে গেল গোসলের জন্য।

মাঝরাতে সুমনের ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। রাতে সে ফিরেও ছিল অনেক রাতে। মিতু তখন ঘুমে। সে ফ্রেশ হয়ে শব্দহীনভাবে মিতুর পাশে শোয়ে পড়ল। মাঝরাতে সে স্বপ্নে দেখেছিল নিবিড়কে৷ নিবিড় খুব একটা বড় বিপদে পড়েছে। সুমন তাকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য গিয়ে নিজেই বিপদে জড়িয়ে গেছে। ঘুম ভাঙলো নিবিড়ের নাম ধরে চিৎকার করে জেগে উঠে।মিতু তখন ও ঘুমে। সুমন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার মনে পড়ল তাদের প্রথম সঙ্গমের কথা।
সেদিন ছিল বৃষ্টির সন্ধ্যা।সুমন আর নিবিড় আটকা পড়ে গিয়েছিল পুরানো এক পোড়া বাড়িতে৷চারদিকে সন্ধ্যা নামার পূর্বেই মেঘের অন্ধকার।পাশাপাশি দুই যুবক। নিবিড়ের তখন সতেরো আঠারো বয়স।আবেগে স্থান কাল বিচার করার বোধশক্তি কম।সে ঝুঁকে সুমনের গলায় চুমু খেল। নিবিড়ের ঠোটের ছোঁয়াতে সুমন কেঁপে উঠল। সে নিবিড়কে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরল৷ নিবিড় আবারো তার গলায় চুমু খেল৷ সুমনে প্রকম্পিত হয়ে নিবিড়কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার ঠোটে চুমু খেল। নিবিড় চুম্মনে সাড়া দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বাহিরে তখন প্রবল বর্ষণ। নিবিড় তার হাতদুটি স্থির রাখেনি। সুমনের সারা শরীর স্পর্শ করতে লাগলো৷ একটা সময় নিবিড় তার এক হাতে সুমনের প্যান্টের জিপার খোলে ফেলল। সুমন নিজের সর্বস্ব নিবিড়ের হাতে সঁপে দিয়ে পরম প্রশান্তিতে ডুবে গেল।সুমন নিবিড়ের দেহের সর্বত্র চুম্মনে ভরিয়ে দিতে লাগল।
বাহিরের এই বর্ষার দিনে একটা সময় উভয় নিজেদের খোঁজে পেল প্রবল এক আবেগে৷ ভালবাসা আর সুখে সেই ভাঙ্গা গৃহে একজন আরেকজনের দেহের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল।প্রেমের প্রথম সঙ্গমে তারা দুজন ই ছিল মুগ্ধ।
আজ এতদিন পরে মাঝ রাতে সেই দিনের কথা মনে পড়তেই সুমনের দু চোখ ভরে উঠল কষ্টের জলে। সে বাহিরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে কয়েকবার নিবিড়ের নাম ধরে ডাকল।

সুমন যখন রাত জেগে নিবিড়ের কথা ভাবছিল নিবিড় তখন পুরানো দিনের কথা ভুলার জন্য মধ্যরাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে নিজেকে সান্তনা দিচ্ছিল।বেঁচে থাকার জন্য নিবিড় কত কিছুই না করছে অথচ দিন শেষে সেই ভালবাসাই তাকে জাগিয়ে রাখে৷ যে মানুষটাকে ভুলার জন্য এত কিছু করে অথচ সেই মানুষটাকেই ভুলা যায় না। ভালবাসা যেন গলায় ফণিমনসার কাঁটার মত বিধে আছে।
সুমন নিবিড়কে বলত, কোন কারনে যদি তারা আলাদা হয়ে যায় তবে যেন সে সুমনকে না ভুলে৷ মনে রেখে দেয়৷ নিবিড় কি সুমনকে দেওয়া সেই কথা রাখার জন্য ই মনে রাখছে তাকে? কী জানি৷ ইশ্বরের কোন খেলায় পুতুল তারা।

অহনা বিকেলের দিকে গিয়েছিল বোর্ড অফিসের বাজারে। সেখানে তার সাথে কইতরীর দেখা৷কইতরীর সাথে তার অনেক কথা হল। সহজ সরল গ্রাম্য মেয়ে। চেহারাটা খুব মিষ্টি।সেখানেই সে শুনল যুবা মাস্টারের কথা৷ তার চেহারার বর্ণনা,মানুষের প্রতি মমত্ববোধের কথা, তার শিক্ষা, ভাল মানুষি। বলা যেতে পারে দীর্ঘ বার্তালাপে কইতরী কেবল যুবা মাস্টারের কথা বলতেই আনন্দিত ছিল। অহনা মেয়েটার শিক্ষকের প্রতি দুর্বলতার কথা বুঝতে পেরে মুখ টিপে বারবার হাসছিল।অহনার ও খুব ইচ্ছে হচ্ছিল একবার তাদের যুবা মাস্টারকে দেখার। ঐদিন জাবের ও বলছিল যুবা মাস্টরের কথা। অহনা প্রসঙ্গ ক্রমেই বলল
-যুবা মাস্টিরের নাম কী?
কইতরী চোখ মুখ বড় করে বলল
-আমি তো তা জানি না৷ আইচ্ছা,জিগায়া দেহুম নে।
কথা শুনে অহনা হেসে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম৷
অহনা খেয়াল করল, এই অঞ্চলের লোকেরা যাকে দেবতুল্য সম্মান করে তারা কেউ ই তার নাম জানে না। অহনার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে ঠেকল যুবা মাস্টার।
বাসায় ফিরে অহনা টিভি চালিয়ে এক মগ কফি নিয়ে বসতেই জাবের এল৷ জাবের এত সন্ধ্যায় দ্রুত আসে না। অহনা তাকে ফ্রেশ হওয়ার কথা বলে কফি বানাতে গেল। জাবের বাথরুম থেকে ডাকল-
-অহনা খবর শুনেছো?
-কী খবর?
-ভাইয়া ভাবি আসছে।
-সুমন ভাইয়া?
-হুম
-কেন?
-আমি বলেছি আসার জন্য।
-কী জন্য বলেছো?
-আসলেই দেখবে। তোমাদের অবাক করে দেওয়ার জন্য।
-ধেৎ, তোমার কথা বার্তা কিছুই বুঝি না।
-বুঝবে গো, বুঝবে। সময় হোক।
জাবের গুণগুণ করে গান গায়তে লাগল।অহনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল
-ভাইয়া কবে আসছে?
-আজকেই।
-রাত হয়ে যাচ্ছে যে।
-হোক।
অহনা কিছু বুঝতে না পেরে কফির মগটা টেবিলে রেখে বারান্দায় চলে গেল।

নিবিড় বাসায় ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে শোতেই বাতাস বইতে লাগল৷ ঝড়ের পূর্বাভাস। এই চড়াঞ্চলে ঝড় মানে ভয়ানক কিছু। নিবিড় ঘর থেকে বের হয়ে এল বাতাসেরর গতি বুঝার জন্য। ঘর থেকে বের হওয়ার পরেই সে নৌকা ঘাট থেকে শব্দ শুনতে পেল। মনে হয় ঐ পাড়ে কেউ আটকা পড়েছে। নিবিড় দৌড়ে গেল। যা ভেবেছিল তাই। নদীর ওপাড়ে দুজন মানুষ। নিবিড় নৌকাটা খোলে ঐপাড়ে নিয়ে গেল।
জীবন কখনো কখনো আমাদের রহস্যে জড়িয়ে বিস্মিত করে দেয়। যার চক্রে না পরার জন্য প্রাণ পণে লড়ি তার চক্রে ই পড়তে হয়। নিবিড়ের নিঃশ্বাস আটকে গেল। এতগুলা বছর পরে সুমন তার সামনে দাঁড়িয়ে৷ এই ঝড় তুফানের রাত্রে। তার হাত পা কেঁপে উঠল, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। সে নিজেকে অনেক কষ্টে সামলে গলায় পেচানো গামছাটায় মুখ ডেকে তাদের এই পাড়ে নিয়ে এল।
সুমন খেয়াল করেনি। যে মানুষটার জন্য তার এত ছটফটানি, এত কষ্ট সেই মানুষটা আজ তার চোখের সামনে। তার বুক কেঁপেছিল ঠিক। মনে হচ্ছিল এই মাঝি তার চিরকালের পরিচিত কেউ কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল না। বরং অবাক হচ্ছিল। এমন কিছু মনে হওয়ার কারনে।
নৌকা ঘাটে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই নিবিড় নৌকা ছেড়ে চলে গেল। মিতু মাঝির এমন অচারণ দেখে অবাক হয়ে গেল। সে সুমনের হাতটা শক্ত করে ধরে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছিল কিন্তু সুমন তখন নিবিড়ের খেয়ালে মজে।

জানি না ইশ্বর কী রেখেছে তাদের ভাগ্যে। তাদের ভাগ্যটা অনেকটাই এমন যে,প্রথমে মিলন লেখাই ছিল কিন্তু পরে তা মুছে দিয়েছে।ফলস্বরূপ এতটা ভালবেসে ও তারা আলাদা। এই যে শূণ্যস্থান, এই যে একাকিত্ব, তার অবসান কি কোন কালেই হবে না?
.......( চলবে )...... 


শূণ্যস্থান-২ শূণ্যস্থান-২ Reviewed by সমপ্রেমের গল্প on April 12, 2019 Rating: 5

1 comment:

  1. খুবই চমকপ্রদ গল্প হয়েছে।পড়ে কল্পনা করতে লাগলাম নিবিড়ের নতুন একটা শূণ্য জীবন! আর সুমনের চেপে রাখা কস্টের নিশ্বাস !! তবে গ্রামের নাম গুলো খুবই পরিচিত মনে হচ্ছে।!?

    ReplyDelete

Powered by Blogger.